গরমের যুদ্ধে জিতবেন যেভাবে: ঢাকায় ঘর ঠান্ডা রাখার উপায়
- anjoncucse
- Mar 19
- 3 min read
এই তো কয়েকদিন আগেও শীতের কম্বল নিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম, আর এখন দেখুন - সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘামে ভিজে যাচ্ছি! দোরগোড়ায় গ্রীষ্ম, আর আমরা ইতিমধ্যেই গরমের ছোঁয়া অনুভব করতে শুরু করেছি।
ঢাকার তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এসি চালালে বিদ্যুৎ বিল আকাশছোঁয়া, আর না চালালে ঘরে এক মিনিট থাকা যায় না! কিন্তু এসি ছাড়া বা কম এসি ব্যবহার করেও কি ঘর ঠান্ডা রাখা সম্ভব? বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে?
চলুন জেনে নিই কিছু টেকনিক যেগুলো খুব সহজে আপনার ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে পারে।
আসল সমস্যাটা কোথায়?
আগে ভেবে দেখি, কেন আমাদের ঘরগুলো এত গরম হয়:
সূর্যের ডাইরেক্ট হিট - বিশেষ করে পশ্চিম দিকের ঘরগুলো বিকেলে ভয়ানক গরম হয়
কনক্রিট হিট ট্র্যাপ - আমাদের বিল্ডিংগুলো দিনে তাপ শোষণ করে রাতে ধীরে ধীরে ছাড়ে
ঘন বসতি - একটা বিল্ডিংয়ের গরম বাতাস পাশের বিল্ডিংয়ে যায়
অনুপযুক্ত ডিজাইন - অনেক আধুনিক ফ্ল্যাটে ভেন্টিলেশন ভালো না
গাছপালার অভাব - প্রাকৃতিক ছায়া নেই, তাই সব উত্তাপ সরাসরি আমাদের ঘরে আসে
নানুর জামানার ঘর এত ঠান্ডা কেন ছিল?
মজার বিষয় হল, আমাদের নানা-দাদাদের আমলের ঘরগুলো এসি ছাড়াই ঠান্ডা থাকত। কারণ:
উঁচু ছাদ - গরম বাতাস উপরে উঠে যেত
মোটা দেয়াল - পুরু দেয়াল তাপ প্রতিরোধ করত
ক্রস ভেন্টিলেশন - বাতাস ঘরের এক দিক দিয়ে ঢুকে আরেক দিক দিয়ে বের হতে পারত
ভেন্টিলেটর - ছাদের উপরে ভেন্টিলেটর থাকত যাতে গরম বাতাস বের হতে পারে
এই যুগের এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এ ঘর ঠান্ডা রাখার ৭ টি টিপস
১। সকাল-বিকেলের "বাতাস ট্র্যাপিং"
আমার দাদি কী করতেন জানেন? সকালে সূর্য ওঠার ১ ঘণ্টা আগে সব জানালা-দরজা খুলে দিতেন। তখন বাতাস সবচেয়ে ঠান্ডা থাকে। ১-২ ঘণ্টা খোলা রাখার পর সব বন্ধ করে দিতেন। এরপর আবার বিকেল ৪টার পর খুলে দিতেন।
টিপস: সকাল ৫টা-৭টা এবং সন্ধ্যা ৬টা-৮টার সময় আপনার বাসার সব জানালা খুলে দিন।
২। ফানেল ইফেক্ট
এটা একটা মজার সাইন্স ট্রিক! আপনি যদি একটা জানালা অল্প খোলেন (যেদিক থেকে বাতাস আসে) এবং বিপরীত দিকের জানালা পুরো খোলেন, তাহলে বাতাসের গতি বাড়বে যাকে বলে "ফানেল ইফেক্ট"।
বাতাস যে দিক থেকে আসে, সেদিকের জানালা ৩০% খুলুন, আর বিপরীত দিকের জানালা ১০০% খুলুন।
৩। জানালার পর্দা সিলেকশন
ডাবল লেয়ার পর্দা ব্যবহার করুন:
ভেতরের লেয়ার: হালকা সাদা/বেইজ, পাতলা কাপড়
বাইরের লেয়ার: ঘন, রিফ্লেক্টিভ, গাঢ় রঙের
দিনের বেলা বাইরের লেয়ারটি বন্ধ রাখুন (বিশেষত পশ্চিম দিকে), এটি সূর্যের তাপ প্রতিহত করবে। ভিতরের পাতলা কাপড়টি বাতাস চলাচলে বাধা দেবে না।
৪। জাদুকরী "ঠান্ডা ফ্যান"
যেই রুম গুলোতে এসি নেই সেখানে এই ট্রিকটা আমি নিজে মাঝে মাঝে ব্যবহার করি! এক বালতি ঠান্ডা পানি নিন, তাতে বরফের কয়েকটা টুকরো ফেলুন। একটা ফ্যানের সামনে রাখুন। ফ্যান যখন ঘুরবে, পানি থেকে ঠান্ডা বাষ্প ঘরে ছড়িয়ে পড়বে।
একজন বন্ধু এটাকে আরো "আপগ্রেড" করেছে - একটা টাওয়েল ভিজিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে ফ্যানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে!
৫। ছাদের মেইনটেনেন্স
টপ ফ্লোরে থাকেন? আপনার জন্য স্পেশাল টিপস:
সাদা রং করুন: ছাদে হিট-রিফ্লেক্টিভ সাদা রং করলে তাপমাত্রা কমে!
ছাদবাগান: ছোট ছোট টবে গাছ রাখুন।
জলছাদ: বিল্ডিং এর সর্বোচ্চ তলার ছাদকে রোদ বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এবং ঘরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ছাদের উপর চুন, সুরকি ও খোঁয়ার সাহায্যে কমপক্ষে তিন ইঞ্চি পুরুত্বের একটি আলাদা আবরণ দেয়া হয়। একে জলছাদ বলে।
৬। আপনার শরীরকে ঠান্ডা রাখুন
শুধু ঘর না, নিজেকেও ঠান্ডা রাখতে হবে:
প্রচুর পানি পান করুন
হালকা, সুতির কাপড় পরুন
দিনে ১-২ বার হালকা গোসল করুন
খাবারে ঠান্ডা সবজি/ফল (কাঁচা শাক, শসা, কমলা) বেশি খান
৭। রাতে ভালো ঘুমের জন্য "সুইপ এন্ড স্প্রে"
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে:
বিছানার চাদর ঝেড়ে ফেলুন
একটু পানি স্প্রে করুন বা হালকা ভেজা নিংড়ানো টাওয়েল দিয়ে মুছে নিন
ফ্যান অন করে ৫ মিনিট শুকাতে দিন
আপনি অবাক হবেন, বিছানায় কি অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি হবে!
৩টি এলিমেন্ট যা আপনার বাড়িতে যোগ করতে পারেন
যদি আপনি আপনার বাড়ি রেনোভেশন করার প্ল্যান করছেন, এই তিনটি জিনিস যোগ করুন:
১। রুফ শেডিং
ছাদে একটা সাধারণ শেড বানান, যেটা সূর্যের আলো সরাসরি ছাদে পড়তে দেবে না। এটা আলুমিনিয়াম, বাঁশ, কাঠ যে কোন কিছু দিয়ে বানাতে পারেন।
২। এয়ার শ্যাফট
বাড়ির মধ্যভাগে একটা খোলা এয়ার শ্যাফট রাখুন (ছোট হলেও চলবে)। এটা একটা চিমনির মত কাজ করবে, গরম বাতাস উপরে উঠে যাবে আর নতুন বাতাস নিচে থেকে আসবে।
৩। জালি দরজা
জালি দিয়ে একটা স্লাইডিং দরজা বানান, যেটা আপনি মূল দরজা জানালার সামনে ব্যবহার করতে পারেন। এতে বাতাস চলাচল করবে কিন্তু পোকামাকড় ঢুকবে না।
গরম নিয়ে হাহাকার না করে, মনে রাখুন আমাদের পূর্বপুরুষরা কোন এসি ছাড়াই বেঁচে ছিলেন। তাদের জ্ঞান আর আধুনিক টেকনোলজির সমন্বয়ে আমরাও পারি বিদ্যুৎ কম খরচ করে স্বস্তির সাথে থাকতে।
সবাই ভালো থাকুন, ঠান্ডা থাকুন!
Comments